"গারড্রো: প্রকৃতির সাথে বন্ধন গড়ে তোলার এআই-চালিত বাগান রোবট"
সংগৃহীত
কেরালার ইঞ্জিনিয়ার প্রিন্স ম্যাম্মন একটি অভিনব এআই-সক্ষম রোবট ‘গারড্রো’ (Gardro) তৈরি করেছেন, যা আগাছা পরিষ্কার, গাছপালার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন বাগান পরিচর্যার কাজে সহায়তা করবে। প্রিন্সের এই রোবট তৈরির অনুপ্রেরণা এসেছে তার শৈশব থেকে, যখন তিনি কোল্লাম, কেরালায় তার বাবার সাথে সবজি খেতে কাজ করতেন। এই প্রাথমিক কৃষি-অভিজ্ঞতা তার মনে প্রকৃতি এবং বাইরের পরিবেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করেছিল।
প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজের শহরে ফিরে এসে, প্রিন্স লক্ষ্য করেন যে আজকাল বাচ্চারা আর তেমনভাবে চাষবাস বা বাইরের খেলাধুলায় আগ্রহ দেখায় না। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন যে আজকের প্রজন্ম ভিডিও গেম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এতটাই মগ্ন যে তারা তার শৈশবের মতো মূল্যবান অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
প্রিন্স বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতের জন্য কৃষির গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে চাষবাস এবং প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই চিন্তা থেকেই তিনি শিশুদের মধ্যে কৃষি ও প্রকৃতির প্রতি কৌতূহল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ‘গারড্রো’ তৈরি করেন, যা তিনি তার কোম্পানি ’ফ্রিম্যান রোবটস’ (Freeman Robots) এর অধীনে বিকশিত করেছেন।
সেলম কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রশিক্ষিত প্রিন্স, ছোটবেলা থেকেই রোবটিক্সের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতেন। তিনি এমন একটি রোবটের কল্পনা করেছিলেন যা ভারতের কৃষি পদ্ধতিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। তার লক্ষ্য ছিল কৃষকদের জীবন আরও সহজ এবং দক্ষ করে তোলা, এবং ভবিষ্যতে দেশে রোবোটিক ফার্ম প্রতিষ্ঠা করা।
২০২১ সালে প্রিন্স ’গারড্রো’ তৈরি শুরু করেন, উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের বাগান করতে উৎসাহিত করা, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সংযোগ বাড়ানো এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা। এই আবিষ্কার বাজারে আনতে তিনি ‘ফ্রিম্যান রোবটস’ প্রতিষ্ঠা করেন।
গারড্রো একটি ছোট আকারের, ব্যাটারিচালিত রোবট, যার ওজন ৫০০ গ্রামেরও কম এবং মাপ ২০ সেমি লম্বা, ১২ সেমি চওড়া এবং ১০ সেমি উচ্চ। এতে একটি ক্যামেরা ও একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন সংযুক্ত রয়েছে। ব্যবহারকারীরা রোবটটি চার্জ করে বাগানে রাখেন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ করেন। গারড্রো সহজেই গাছের নিচ দিয়ে চলাফেরা করে আগাছা শনাক্ত করে তা সরিয়ে দিতে পারে।
এছাড়া, গারড্রো-তে উন্নত সেন্সর এবং অ্যালগরিদম রয়েছে, যা গাছের স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির তথ্য প্রদান করে। রোবটের এআই সিস্টেম সুস্থ গাছের ছবির সাথে বাস্তব সময়ের ছবির তুলনা করে গাছের অবস্থা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য জানায়। ব্যবহারকারীরা মোবাইল ডিভাইসে সরাসরি রোবটের লাইভ ফুটেজ দেখতে পারেন এবং চাইলে এক ক্লিকেই সেটিকে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (VR)-তে রূপান্তর করতে পারেন। এতে তারা ‘অ্যান্ট-ম্যান’ সুপারহিরোর মতো বাগানটিকে বিশাল আকারে দেখতে পাবেন।
প্রিন্স মনে করেন, এই আকর্ষণীয় ভিউ শিশুদের বাগানে আগ্রহী করে তুলতে পারে। ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লে এবং সঙ্গী অ্যাপের মাধ্যমে শিশুরা বিভিন্ন গাছের প্রজাতি, তাদের যত্নের প্রয়োজনীয়তা ও তাদের বাগানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারবে।
গারড্রো আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাজারে আসবে এবং এর দাম হবে প্রায় ₹১০,০০০ থেকে ₹১৫,০০০-এর মধ্যে। প্রিন্স আশা করছেন, এই রোবট বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্যও বাগান করাকে সহজ ও আরামদায়ক করে তুলবে, যাতে তারা উৎপাদনশীল ও আনন্দময় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
গারড্রো তৈরি করা সহজ ছিল না। মূলধন সংকটের কারণে প্রিন্স প্রথমে চাকরি ছেড়ে নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেন, কিন্তু পরে আবার চাকরিতে ফিরে আসতে হয় প্রকল্পের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। বর্তমানে তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যাতে একটি উৎপাদন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা যায়।
গারড্রোর মাধ্যমে প্রিন্সের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে আবার বাগান করার আনন্দ ফিরিয়ে আনা, যেমনটি তিনি নিজের শৈশবে অনুভব করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই রোবট সব বয়সের মানুষের মানসিক চাপ দূর করতে এবং প্রকৃতির সাথে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর করতে সহায়তা করবে। তরুণ প্রজন্মের জন্য, এটি বাড়িতে বসেই বিভিন্ন সবজি ও ফল চাষের এক দারুণ সুযোগ এনে দেবে।